শেষ কয়টা বসন্ত

মানুষ বাঁচে বর্তমান আর ভবিষ্যতকে পুঁজি করে।কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা পড়ে থাকে সেই অতীতেই।অতীতকে নিয়েই তারা বর্তমানে বাঁচে আর ভবিষ্যতে চলার প্রেরণা খুঁজে। এমনিই একজন মানুষ শুভ্র।কিন্তু একসময় সে অন্যদের মত বর্তমান আর ভবিষ্যতকে নিয়েই জীবনের স্বপ্নগুলো দেখতো।কারণ তখন তার সাথে যে দেখা হয়েছিল তার প্রিয় মানুষ মোহনার।মোহনা যেন এক বিশাল স্রোত নিয়ে শুভ্রর জীবনে হানা দেয়।সে থেকেই শুভ্র আর মোহনা একজন আরেক জনের পরিপূরক।বলছি শুভ্রর কলেজ জীবনের কথা।কলেজের প্রথম দিন প্রথম ক্লাসেই শুভ্রর সাথে মোহনার পরিচয়।একসময় সে পরিচয় ভালবাসায় পরিণত হয়েছে কিনা জানা যায় নি। দুজনের অবচেতন মনে কি কিছু দোলা দিয়েছিল?।প্রথম চিঠি শুভ্রই লেখেছিল।তবে প্রেম নিবেদন করতে নয়, আবার হতেও পারে।এরপর প্রতিদিন কলেজ শেষে তাদের চিঠি দেওয়া নেওয়া চলত।মোহনার ভাল লাগত দক্ষিণা হাওয়া আর শুভ্রর ভাল লাগত সে হাওয়ায় মোহনার চুলেরর দোলা।মোহনার ভাল লাগতো বকুল ফুল আর শুভ্রর ভাল লাগত মোহনার ভুবন ভোলানো হাসিকে।তাই শুভ্র মোহনাকে প্রতিদিনই কলেজের বকুল তলায় নিয়ে যেত।।তখন মোহনার হাসির কারখানা বসতো আর ফুল তুলতো।আর শুভ্র সেই সুযোগে দেখে নিত প্রিয় মুখের প্রিয় হাসিটি।পুকুর পাড় টা আবার দুজনেরই প্রিয় ছিল। এখানে বসেই দুজন দুজনকে মনের ভাব প্রকাশ করত। যা বলতে না পারতো তা রূপ নিত চিঠিতে। শুধু চিঠি নয়, রুমালে করে কবিতাও লিখে দিত শুভ্র । তবে কবিতা গুলো লিখা হতো বিশেষ কিছু দিনে বিশেষ কিছু কারণে।এর মধ্যে মোহনার রাগ ভাঙতে হলে মোহনাকে উৎসর্গ করে রুমালে লেখা কবিতা লাগতোই। কলেজের প্রতিটি জায়গা, প্রতিটি গাছও যেন তাদের এই বন্ধনে মুগ্ধ। শুভ্র কখনো মোহনার হাত ধরে নি।এক কালবৈশাখীর ঝড়ের সময় মোহনাই ভয়ে শুভ্রর হাত ধরেছিল। তবে দুটি বসন্তেরর বেশি তাদের এই বন্ধন স্থায়ী হয়নি।আসলে প্রকৃতি বড়ই নির্মম।দুজনের একসাথে থাকা যেন প্রকৃতির সহ্য হয়নি।কলেজ জীবনের শেষের দিকে মোহনার বিয়ে হয়ে যায় এক ব্যবসায়ীর সাথে।সে থেকেই শুভ্রর অতীত নিয়ে বেঁচে থাকা শুরু।আজও সেই পুকুর ঘাট, বকুল তলা শুভ্রর কাছে বিশেষ কিছু।শুভ্র ভাবে এখনও কি মোহনার মনে পড়ে সে দিন গুলোর কথা? কবিতা লেখা রুমালগুলো কি এখনও মোহনার কাছে আছে? চিঠি গুলো ছিড়ে ফেলেনি তো? ইতো মধ্য, মোহনা মঞ্চে নিজের পরিচয় আর স্মৃতি চারণ করতে যায়। মোহনার নাম শুনে হুস ফিরলো শুভ্রর। আধা পাঁকা চুল,চোখে চশমা, পড়নে শাড়ি,মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট।এই হলো সেই ৩০ বছর আগের শুভ্রর মোহনা।সবকিছু পরিবর্তন হলেও হাসিটা ঠিক আগের মতই আছে।শুভ্রর মাথা তখন কাজ করছিল না।সবকিছু যেন থমকে গেছে।খোঁচা খোঁচা আধা পাঁকা দাড়ির শুভ্র চশমাটা মুছে আবার মঞ্চে তাকায়। মোহনা তার পরিচয় দিল। স্বামীর সাথে নাকি বিয়ের একবছর পরই বিচ্ছেদ হয়ে যায়।এরপর আর বিয়ে করেন নি।শুভ্রর কথাগুলো শুনে খুব খারাপ লাগলো ।কারণ, প্রিয় মানুষের খারাপ কেউ চায় না।নিজের সাথে মিলন হয়নি তো কি হয়েছে,মানুষটা সুখে থাকুক এটা সব মানুষই চায়। শুভ্র ও এর ব্যতিক্রম নয়।আজ ৩০ বছর পর তাদের কলেজ ব্যাচের পূর্ণমিলন হলো।কলেজ জীবনের সবাই আজ একত্রিত হয়েছে। সবার স্মৃতি গুলোও আজ একত্র হয়েছে।শুভ্র কলেজ জীবন শেষে কলেজ জীবনের স্মৃতিগুলোকে সঙ্গী করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল উচ্চ শিক্ষার জন্য।আর মোহনা গিয়েছিল শ্বশুর বাড়ী। সে শোকে বিয়েটাও করেনি শুভ্র।পূর্নমিলনী অনুষ্ঠান শেষে দুজনের কথা হয়।৩০ বছর পর আবার তাদের কথা হল সেই পুকুর পাড়ে।আবার যেন বসন্ত ফিরে আসলো ৩০ বছর পরে। গাছ গুলো আবার আগের মত দোলা দিচ্ছে, বকুলফুল গুলো আজ সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছে।শুভ্র মোহনাকে বলে, থাকবে কি আমার সাথে শেষ কয়টা বসন্ত? তারপর দুজনই চুপ।মোহনা শুভ্রর হাতটা ধরে।দুজনের চোখ দিয়েই আজ সুখের ঝরণা বইছে।গত ৩০ বছর যাবত যা ছিল বেদনার জল। অতঃপর, তাদের জীবনে আবার বসন্ত এসে গেল।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s